বিএনপির শুভবুদ্ধি অথবা বুদ্ধিবিনাশ

  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৩:৩০ এএম, ২৮ জানুয়ারি ২০১৯

কাগজে কলমে যাই থাকুক না কেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিতে যে তারেক রহমানই শেষ কথা সেটা সবারই জানা। অন্তত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্কাইপের মাধ্যমে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার ও মনোনয়নদানে তার অপরিহার্যতা, সেটা দীর্ঘ সময় পর জানান দিলেও বর্তমান সরকারের অধীনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনসহ কোনো নির্বাচনে বিএনপির না যাওয়ার সিদ্ধান্তে আবারও প্রমাণ হয়েছে। বহির্বিশ্ব থেকে শুরু করে দলের প্রবীণ নেতা বা বুদ্ধিজীবীরা বিএনপিকে শুদ্ধ করার যতই চেষ্টা করুক না কেন, বিএনপি কারও কথায় গা করে না। দলটি চলবে তারেক রহমানের বুদ্ধিতে আর জামায়াতের শক্তিতে।

২৪ জানুয়ারি সকালে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন সিটি নির্বাচন বা উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি যাবে কিনা? ফখরুলের সরল উত্তর ছিল, তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। পরক্ষণেই তিনি আরও একটু যোগ করলেন, বিকেলে দলের যে স্থায়ী কমিটির বৈঠক হবে, সেখান থেকেই আসবে সিদ্ধান্ত। যথারীতি স্থায়ী কমিটির বৈঠক হলো এবং লন্ডনে পলাতক দলীয় নেতার পক্ষ থেকে আসা সিদ্ধান্ত জানানো হলো সাংবাদিকদের।
সিদ্ধান্তগুলো যে ভুল এবং তা ক্রমশ বিএনপিকে বিভক্তিসহ অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে সেটি হয়তো ক্রমে স্পষ্ট হবে। ৩০ জানুয়ারির নির্বাচনে ধরাশায়ী বিএনপি এখন সত্যিকার অর্থে ভুগছে আস্থার সংকটে, ভুগছে নেতৃত্বের সংকটে। দলটির নেতাকর্মীদের পরস্পরের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস এতটাই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে, মির্জা ফখরুল ইসলামের সঙ্গে বগুড়া জেলা বিএনপি সভাপতি সাইফুল ইসলামের বাকবিতণ্ডা হয়েছে। সংবাদপত্রে মহাসচিব সাইফুল ইসলামের জ্যাকেটের কলার ধরেন এমন ছবিও প্রকাশ পেয়েছে। আরও কতো বাকবিতণ্ডার ছবি অপ্রকাশিতই থেকে যাচ্ছে। দলটির সিনিয়র নেতারা অনেকে সরকারের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও তুলছেন পরস্পরের বিরুদ্ধে। বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে কথা শুরু হয়েছে মূলত গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেনের হাত ধরে বিএনপির নির্বাচনে আসার পর থেকে। শুরু থেকে যে সন্দেহ অবিশ্বাস ছিল না তা নয়, ঐক্যফ্রন্ট জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, কে রাষ্ট্রপতি হবেন তা নিয়ে আলোচনা তো ছিলই। তবে সেসব এখন ইতিহাস। নির্বাচনের পর এসব ইতিহাসকে খানিকটা উসকে দিয়ে নিরপেক্ষ এবং আপাত নির্দোষ ভাব নিয়েছেন ড. কামাল হোসেন। তিনি আবারো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের ঘাটছড়া বাঁধার প্রসঙ্গটি। তিনি নাকি জানতেনই না জামায়াত বিএনপির সঙ্গে যাবে। জামায়াত থাকলে তিনি ঐক্যফ্রন্টে থাকতেন না বলেও সাংবাদিকদের জানান। কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে, কামাল হোসেনের প্রতি বিএনপির তৃণমূল থেকে শুরু করে বড় একটি অংশ শুরু থেকেই বিরক্ত। নির্বাচনের পর সেটি আরও প্রকট হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন স্পষ্ট করে বলেছেন, কামাল হোসেনের অধীনে নির্বাচনে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। তাদের কোনো জনসম্পৃক্ততা নেই বলেও কটাক্ষ করেছেন তিনি। তার মতে, দলে এর চেয়ে ভালো ও সিনিয়র নেতা রয়েছেন, তাদেরই সুযোগ দেয়া উচিত ছিল। এর ক’দিন পরেই দল নিয়ে আরও একটু সাহসী বক্তব্য এলো স্থায়ী কমিটির অপর দুই সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মওদুদ আহমদের কাছ থেকে। তারা চান দলের নতুন নেতৃত্ব। নতুনদের সুযোগ আসুক। দলকে পুনরায় শক্তিশালী করতে নানা প্রস্তাবনা তারা তুলে ধরেন। এর সঙ্গে সুর মেলান বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ডা. জাফরুল্লাহও। তিনি চান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ইমেরিটাস চেয়ারপারসন হিসেবে রেখে তারেক রহমানকে কমপক্ষে দুই বছর রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে! তারেক রহমানের বাইরে গিয়ে দলকে যে পুনর্গঠন করবে তেমন নেতৃত্বও দলের মধ্যে নেই। বিএনপি মূলত পরিণত হয়েছে ককটেল পার্টিতে। যেখানে জাতীয়তাবাদের মিশেল আছে, কোণঠাসা মুক্তিযোদ্ধারা আছেন, জিয়াউর রহমানকে ভালোবাসেন এমন প্রবীণ নেতা আছেন, আর তারেক রহমানকে ভালোবাসে নবীনের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানের ভাবশিষ্যরা। অনেকের প্রশ্ন হতে পারে জোটে কাদের সিদ্দিকী, মো. ইবরাহীমের মুক্তিযোদ্ধারাও তো রয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধার সম্মান ধরে রাখাটা ততটাই কঠিন যেটা কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে জামায়াত নেতাদের ঘনিষ্ঠতা বা তাদের পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে। ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর বিএনপির মধ্যে জামায়াতের বিরোধিতা বেশি করেছিলেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও অলি আহমেদ। সে কারণে দল ছাড়তে হয় তাদের। একই কারণে তরিকুল ইসলামও বেশি দিন বিএনপির মহাসচিব থাকতে পারেননি। কাজেই তারেক রহমান ছাড়া বিএনপি আর তারেক রহমানের জোর সমর্থন থাকা জামায়াত ছাড়া বিএনপির পক্ষে দিন দিন অকল্পনীয় হয়ে উঠছে। কারণ, জামায়াত এখন আর কাগজে কলমে নিষিদ্ধ না হলেও দল হিসেবে স্বীকৃত নয়। কাজেই বিএনপির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে ধারাটি ছিল, জামায়াতের চাপে সেটি ধীরে ধীরে লয় হয়ে উগ্র ভাবধারাটা জেগে উঠছে।

এক-এগারোর পরিস্থিতির পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট মাত্র ৩২টি আসনে জয়লাভ করেছিল। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দলটি বর্জন করে, যেটি ছিল কৌশলগত ভুল। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেওয়া সঠিক হলেও ভারতসহ আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন কোনদিকে তা বিএনপির নেতারা আঁচ করতে পারেননি। অনেক চেষ্টা-তদবিরের পরও তারেক রহমানকে এখনো আস্থায় নেয়নি বিশ্ব সম্প্রদায়। কারণ, মাঠের রাজনীতিতে তারেক রহমান পরীক্ষিত নেতা নন। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশের কাছে। সে কারণে বারবার বিএনপি নেতারা ধরনা দিতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। এজন্য হয়তো আবারো বিএনপির মধ্যে মাথাচাড়া দিচ্ছে ভারত বিরোধিতা।

নির্বাচনে না যাওয়ার মতো একই ভুল বিএনপি আবারো করতে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটির উপনির্বাচন বা উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে। নির্বাচনে অংশ নিলে ভোট চুরি, ডাকাতি, কারচুপি বা যাই হোক না কেন বলার মতো একটা জায়গা থাকে। শুনুক বা না শুনুক নালিশ জানানোর মতো ভাষা থাকে। কেউ দেখুক বা না দেখুক ইতিহাসে লেখা থাকে অনেক কিছুই। বিএনপি সেটি থেকেও বঞ্চিত হবে। কারণ, এ কথাতো ঠিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেকে তথা দেশকে এখন যে উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন বা বহির্বিশ্বের কাছে তার যে ভাবমূর্তি তাতে বিএনপি কী করলো না করলো তা নিয়ে কারো খুব বেশি মাথাব্যথা নেই। বরং সরকারি দল খালি মাঠে খেলা খেলেই যাবে। কারণ, গোল করাটাই লক্ষ্য। দেশকে গোলের দিকে নিয়ে যাওয়াটাই এখন লক্ষ্য। তাতে বিএনপি মাঠে নামলো কী সাইড লাইনে বসে থাকলো, জনগণের তাতে কিছুই আসে যায় না।

প্রিয় পাঠক, আপনিও হতে পারেন আওয়ার বাংলা অনলাইনের একজন সক্রিয় অনলাইন প্রতিনিধি। আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা, অপরাধ, সংবাদ নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুনঃ [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :