রমজানে চাঁদাবাজি আর মূল্য নিয়ন্ত্রণ চান ব্যবসায়ীরা

  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১২:৪৪ পিএম, ২৮ মার্চ ২০১৯

পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে মূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রমজানে বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে বলে মত দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আর বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

আসন্ন রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন, আমদানি, মজুত অবস্থা ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আজ বুধবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। বৈঠকে সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়ীরা বৈঠকে দ্রব্য মূল্যের নিয়ন্ত্রণের জন্য মন্ত্রণালয়কে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। এছাড়াও সড়ক পথে চাঁদাবাজি বন্ধ, যানজটে পণ্য নষ্ট হওয়ার সমাধান, জাল টাকা প্রতিরোধ ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের মতামত দেন।

এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘আশ্বস্ত হতে চাই রমজান মাসে ভোগ্য পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকবে। প্রয়োজনে বিশেষ ব্যবস্থা নেবো, তবুও পণ্যের বাজার মূল্য বাড়তে দেবো না।’

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলেন, ‘রমজানে মাংসের দাম বাড়ার কোন সম্ভাবনা নেই। দেশের বাইরে থেকে মাংস আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কিন্তু বাজার আমদানি করা মাংসে সায়লাব হয়ে যাচ্ছে। এটি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেই বাজারে মাংসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। যথাযথ ব্যবস্থা নিলে গরুর মাংস ৩০০ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব।

বৈঠকে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘রমজানের আগেই বাজারে তেজী ভাব লক্ষ করছি। ১২০ টাকায় ব্রয়লার মুরগী পাওয়া যেতো, সেটি এখন ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। ১০০ টাকার নিচে বাজারে সবজি পাওয়া যাচ্ছে না।’

তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেন, ‘সিস্টেমে এসে হোলসেলার যদি ৫০ পয়সা অথবা একটাকা লাভ করে, খুচরা ব্যবসায়ী যদি পাঁচ টাকা লাভ করে তাহলে বাজারে এক পয়সাও তেলের দাম বাড়বে না। যারা রিটেইলার, তারা যদি বলে আমরা পাঁচ টাকায় খুশি তাহলে আর সমস্যা থাকে না।’

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাফেজ মো: এনায়েতুল্লাহ বলেন, ‘বর্তমানেসব পণ্যই পর্যাপ্ত আছে। সুতরাং দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। শুধু নিয়ন্ত্রণটা ঠিক রাখতে হবে, পরিবহন ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে আনলে কোনো সমস্যা থাকবে না।’

বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজি শফি মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের কাছে যে পরিমাণ মাল মজুদ আছে, তাতে মূল্য বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে রমজানে নতুন কোনো ভালো মানের ছোলা আমদানি করলে দুই-চার টাকা বাড়তে পারে।’

বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব শফিউল ইসলাম বলেন, ‘চট্টগ্রামের বিভিন্ন গোডাউনে মাল স্টক করা হচ্ছে। তারা যেই দামে বিক্রি করছে, সেই দামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদেরও বিক্রি করতে হয়। কার কাছে কী পরিমাণ স্টক আছে সেটি সরকার জানে।’

ঢাকা মহানগর ফল আমদানি রফতানিকারক ও আড়ৎদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকী বলেন, ‘পর্যাপ্ত পরিমাণ খেজুরের মজুদ আছে। দাম গতবারের তুলনায় কমেই বিক্রি করব, বেশি দামে বিক্রি করব না। গতবার বিক্রি করেছিলাম ৬৫ থেকে ৭৫ টাকার মধ্যে। সাধারণ মানুষ জাহিদী খেজুর (ভেজা খেজুর) খায়।’

পেঁয়াজ আমদানিকারক মো: হাফিজুর রহমান বলেন, ‘পেঁয়াজের মূল্য নিয়ে সমস্যা হবে না। পেঁয়াজ এখন উঠতে শুরু করেছে। তবে অতি বৃষ্টি হলে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, তা দিয়ে চাহিদা পূরণ হয় না। ভারত থেকে বছরে ১০ লাখ টনের অধিক পেয়াজ আমদানি করতে হয়।’

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অতিরিক্ত সচিব (বাণিজ্যক পরিচালক) মীর জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে উৎপাদিত ৭৯ হাজার ৮৫০ মেট্রিক টন ও আমদানি পর্যায়ে ৮৪ হাজার ৬৭৫ মেট্রিক টন চিনি আছে। মোট এক লাখ ৬৪ হাজার ৫২৫ মেট্রিক টন চিনি আছে। রমজানে বাজারে ছাড়ার জন্য যা পর্যাপ্ত। তাই চিনির দাম বাড়ার কোনো সম্ভবনা নেই।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রতিনিধি জানান, টার্গেট আছে তিন লাখ হেক্টরের বেশি সবজি উৎপাদন করার। সেটি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। যখনই সবজি উৎপাদন শুরু হবে বাজারে সবজির দাম কমে যাবে। আগামী একমাসের মধ্যে বাজারে সবজির দাম অনেকটাই কমে যাবে।’

চাঁদাবাজির বিষয়ে পুলিশ জিরো টলারেন্সে থাকবে জানিয়ে পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি এস এম রুহুল আমিন বলেন, ‘চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নির্দেশনা দেওয়া আছে। রমজানে আরও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া থাকবে। এ ব্যাপারে পুলিশ জিরো টলারেন্সে থাকবে। ব্যবসায়ীদের বলতে চাই, চাঁদাবাজির ঘটনা কোথাও ঘটলে নিকটবর্তী পুলিশকে অবহিত করুন। লোকাল থানা ব্যবস্থা না নিলে এসপির কাছে যান। লোকাল পুলিশ-এসপি ব্যবস্থা না নিলে পুলিশ সদর সদফতরে স্পেশাল সেল থাকবে, সেখানে অভিযোগ করতে পারবেন।’

বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন ভোগ্য পণ্যের দামের চেইনটা যদি দেখভাল করা যায়, তাহলে পণ্যের দাম বৃদ্ধি হবে না। এটা গুরুত্বসহকারে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেখব। আর স্তরভিত্তিক মূল্য চেইনের বিষয়ে ব্যবসায়িরাও একমত হয়েছেন। ফলে রমজানে ভোগ্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কোনো আশঙ্কা দেখছি না।’

সভায় বাণিজ্য সচিব মো. মফিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান জ্যোতির্ময় দত্ত, টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালসহ এনবিআর, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রিয় পাঠক, আপনিও হতে পারেন আওয়ার বাংলা অনলাইনের একজন সক্রিয় অনলাইন প্রতিনিধি। আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা, অপরাধ, সংবাদ নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুনঃ [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :