রক্তে রাঙা বর্ণমালা

  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৫:৩৩ এএম, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বাংলা ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষার বর্ণমালা রক্ত রাঙানো স্মৃতিপথ বেয়ে আসে নি । বাংলা ভাষা পেরিয়ে এসেছে অনন্য গৌরবের ইতিহাস। বাঙালির রক্ত মিশে আছে বাংলা ভাষার প্রতিটি বর্ণমালায়: স্বর ও ব্যাঞ্জণ বর্ণে।

জাতীয় ইতিহাসের সেই সংগ্রামী মহান অধ্যায় মনে পড়ে ফেব্রুয়ারি এলে। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী ফেব্রুয়ারি মাস অতীতের অধ্যায়গুলোর পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জাগৃতি ও জাগরণের বার্তা নিয়ে আসে। ফেব্রুয়ারির ফাগুনময় স্পর্শে সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন ও ব্যবহার নিশ্চিত করার পথে এগিয়ে যেতে বিশেষভাবে প্রত্যয়দীপ্ত হয় সমগ্র জাতি।

ঐতিহাসিক ১৯৫২ পেরিয়ে ভাষা আন্দোলনের ৬৭তম বছর এসেছে ২০১৯ সালে। বাংলা ভাষার অর্জন ও অগ্রগতি এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে মূল্যায়নের জন্য ৬৭ বছর খুব কম সময় নয়। স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ব্যক্তিগত স্তরে সেই মূল্যায়নের ধারা লক্ষ্য করা যায় এ মাসটিতে। এসব অতি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নের সময় দুঃখজনকভাবে আমাদের এ কথাও মনে রাখতে হয় যে, সাম্প্রতিক সময়ে একজন মন্ত্রীকে বলতে হয়েছিল, ‘তাঁর মন্ত্রণালয়ে যেন বাংলায় চিঠিপত্র পাঠানো হয়।’ আরেকজনকে ‘রেডিওসহ নানা মিডিয়ায় বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধের সঙ্কল্প প্রকাশ’ করতে হয়েছিল।

ফলে অর্জনের অনেকগুলো সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার ক্ষেত্রগুলোকে স্বীকার করতে দ্বিধা থাকা উচিত নয়। কোর্ট-কাচারি-অফিস-আদালত-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষার প্রকৃত অবস্থা ও দুরবস্থার চিত্র দেখলে বাস্তব পরিস্থিতি আঁচ করতে কারোই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

মনে রাখা ভালো, বিশ্বায়ন ও দ্রুততর যোগাযোগের চলমান বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত অন্য ভাষা শিখতে কেউ নিষেধ করছে না। কিন্তু মাতৃভাষাটিকে ভালোভাবে না শিখে কিংবা মাতৃভাষাকে নানা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে-মিশিয়ে বিকৃত করে ফেলে এগিয়ে চলাটা একবারেই ভুল একটা পথ। এই পথে শিক্ষা বা উন্নতি হবে বলে যারা ভাবেন, তাদের অবস্থান বোকার স্বর্গে।

ভাষাকে সর্বস্তরে সুদৃঢ় ও সুপ্রযুক্ত করলে হলে এই বিকৃতির ধারাকে ঠেকাতেই হবে। কারণ, বিকৃত বা অশুদ্ধ বা অনেক ভাষার অবৈজ্ঞানিক জগাখিচুরির দ্বারা প্রদেয় শিক্ষার ফলে কোনও ভাষার প্রতিই সুবিচার হয় না। এতে মুখে এক ধরণের লাগাম-ছাড়া কথ্য-বুলি ফোটে বটে, কাজের কাজ বা চিন্তা-বিশ্লেষণের ক্ষমতা জন্মায় না। সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এইসব শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে সফলতা দূরঅস্ত, জায়গাই পায় না।

অতি-উৎসাহী অভিভাবকরা অতি-উচ্চাশার ফলে সন্তানদের এক লাফে সবজান্তা-পণ্ডিত বানাতে গিয়ে এমন বিপদ ঘটান। মতলববাজ কিছু শিক্ষা-ব্যবসায়ী সুযোগটিকে কাজে লাগায়। পাবলিক স্কুল, গ্রামার স্কুল নাম দিয়ে সুপরিকল্পিত সিলেবাস অনুযায়ী না চলে একটি আলগা চমক বা আকস্মিক বাহবা দেখিয়ে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করা হয়। মৌলিক ভাষা শিক্ষাটি থেকে যায় সুদূরপরাহত।

সামাজিকভাবে দ্বিতীয় আরেকটি বিপদ আসে মিডিয়া তথা টিভি-রেডিও’র কারণে। বাচ্চাদের কানে যা প্রবেশ করছে, সেটাকে আসল ও আর্দশ ভাষা ধরে নিচ্ছে তারা। খিস্তি-খেউড়, বিকৃত-প্রকাশ, নানা ভাষার অসামঞ্জস্যপূর্ণ মিশ্রণ তাদের মগজে আশ্রয় পাচ্ছে। বিশুদ্ধ ও পরিশীলিত ভাষা প্রবাহ থেকে যাচ্ছে নবপ্রজন্মের অধরা।

তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন জাতীয়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, যেমন, বাংলা একাডেমি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন মারাত্মক ভুল ধরনের কিছু করেও ভাষার বিপদ বাড়াচ্ছে। মিডিয়া থেকে জানা যাচ্ছে, কিছুদিন আগেই মৌলভীবাজার এলাকার কথিত এক লেখকের বিকৃত তথ্য সম্বলিত পুস্তক নানা স্কুলে পাঠ্য করার তথ্য। এমন ঘটনা একটি নয়। অসাধু ব্যবসায়ী ও অসৎ শিক্ষক নেতৃত্ব স্কুল-কলেজে বাজে বই পাঠ্য করায় এমন বিপত্তি ঘটছে। জাতীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভুল তথ্যপূর্ণ বই নিয়েও মিডিয়ায় রিপোর্ট এসেছে। মুক্তিযুদ্ধসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভুল, বিকৃত ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে বই প্রকাশের খবর প্রায়শই মিডিয়ায় আসে। ফলে ভাষাচর্চা ও ভাষাশিক্ষা নিয়ে আশার সঙ্গে সঙ্গে কিছু হতাশাও এসে যুক্ত হচ্ছে এইসব প্রাতিষ্ঠানিক ভ্রান্তির কারণে।

আরো একটি বিষয় নিয়ে বলার আছে। তা হলো, ভাষার মাসের একটি বড় ঘটনা বইমেলার আয়োজন। যার পেছনে মূল লক্ষ্য ভাষার সমৃদ্ধি হলেও বাণিজ্যিক মতলবই প্রকট হচ্ছে বেশি। বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্য, গল্প, কবিতা, জ্ঞানগত পুস্তক অনুবাদ প্রাধান্য পাচ্ছে না। বাংলা ভাষাকে বৈশ্বিক ভাষার মণি-মাণিক্য নিয়ে সমৃদ্ধও করা যাচ্ছে না। তার বদলে বের হচ্ছে ভুল ভাষা, বানান ও তথ্যে ভরা চটকদার নানা বই।

প্রকাশিত বইগুলোও সুলিখিত, সুসম্পাদিত নয়। তথ্য ও বানানের ভুল থাকছে। বাক্য গঠন ও শব্দ প্রয়োগের ত্রুটিও চোখে পড়ছে। বইমেলার আগে স্রোতের মতো বই বের করে লেখক হতে গিয়ে গুণগত বা প্রকরণগত মান বজায় রাখা হচ্ছে না। দুঃখের বিষয় হলো, গুণ ও মান নিরূপণের আদৌ কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই দেখা যাচ্ছে না এসব ক্ষেত্রে। এই সুযোগে অজস্র ফ্রি-স্টাইল প্রকাশনার জঞ্জাল ভাষার উপকারের চেয়ে বিপদই বরং বৃদ্ধি করছে!

এসব অনাসৃষ্টিজাত সমস্যা থেকে উদ্ভূত বিপদের আঘাত একটি নয়, একাধিক। কারণ ভাষার দুর্বলতা মানুষের বোধ, উপলব্ধি, চিন্তা ও গ্রাহিকাশক্তিকে ক্ষূণ্ন করে। ভাষার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দুর্বলতা যখন সমষ্টিগত দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সামাজিক কোনও চিন্তায় বা নীতি-নির্ধারণে গোষ্ঠীগত বা জাতিগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তখন সেই সমাজের পক্ষে একটি ভয়াবহ পরিণতি দেখা যায়। কেননা, চিন্তন ক্ষমতার দুর্বলতা সমাজের যুক্তি ও বিশ্লেষণকে ভোঁতা করে ফেলে এবং অবনতি ও অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যার শেষ পরিণতি স্থবিরতা ও ধ্বংসাত্মক হতে বাধ্য।

সব দিক বিবেচনা করে বলা যেতে পারে, ভাষা ও ভাষাশিক্ষা নিয়ে ভুল পদক্ষেপ, হেলাফেলা বা দায়িত্বহীনতা মোটেও কাম্য হতে পারে না। কারণ, মানুষ হিসাবে আমাদের স্বার্থকতার বহুলাংশই নির্ভর করছে ভাষার উপরে। ভাষার মাসে এবং সারা বছরই, মাতৃভাষা নিয়ে হতাশা কাটিয়ে আশা জাগাতেই হবে। আন্দোলন ও রক্তদানের ঐতিহ্যস্নাত ফেব্রুয়ারিতে ভাষার পক্ষে সোচ্চার হওয়া এ কারণেই জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন :