ভোট কেন্দ্রে ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা, কোর্টে যাবেন ড. কামাল

  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:২৪ এএম, ০২ ডিসেম্বর ২০১৮

 

 

ভোট কেন্দ্রে ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আদালতে যেতে পারেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ উচিত নয়। এর বিরুদ্ধে আমরা আদালতে যেতে পারি।’

তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের স্বাধীনতার বিষয়টি নৈতিক ব্যাপার। কেন্দ্রে ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা অনৈতিক। যে দেশে আইনের শাসন আছে সেখানে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা অপ্রাসঙ্গিক। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. কামাল হোসেন এবারের নির্বাচনে অংশ নেবেন না। অনেকেই তার অংশ না নেয়াকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন- এ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ষড়যন্ত্র শব্দটা আমার দেশে অনেক বেশি ব্যবহার হয়। আমার এটা খুবই বিরক্ত লাগে। আমার বয়স ৮০ বছর। জাতির জনকের কেবিনেটে যারা ছিল তাদের মধ্যে একজনই বেঁচে আছেন। ২০০৮ সালেও আমাকে নির্বাচন করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, আমি করিনি। এখন অনেক যোগ্য ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদ উঠে আসছেন। তাই আমি নির্বাচন করছি না।’

ভোটের পরিবেশ নিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী এবং নির্বাচন কমিশনারকে বলেছিলাম, যেন নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা না হয়। কিন্তু গ্রেফতার চলছেই। পাইকারি হারে গ্রেফতার করা হচ্ছে। নির্বাচনের জন্য যে ধরনের পরিবেশ দরকার গণগ্রেফতার বন্ধ না হলে তা তৈরি হবে না।’

দেশের জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় নির্বাচনকে বাধা দেয়ার কথা দেখা যাচ্ছে। সরকার বা যে কেউ বাধা দিক, আমরা সবাই মিলে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে রক্ষা করব।’ আমি চট্টগ্রাম, সিলেটসহ কয়েকটি বিভাগের লোকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা পরিবর্তন চায়, অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়।

ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা সবাই সতর্ক থাকবেন, সকাল সকাল কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবেন। পাড়া-প্রতিবেশী সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রে যাবেন।’ ‘আমার বিনীত নিবেদন আপনারা কষ্ট করে নির্বাচনের ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের নিয়ে সকাল সকাল ভোট কেন্দ্রে চলে আসবেন। বুথ খোলার সঙ্গে সঙ্গে আপনারা সেখানে উপস্থিত থাকবেন। প্রত্যেক বাড়িতে যত ভোটার আছে সবাই যেন ভোট দেয় সেটা নিশ্চিত করবেন।’

তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হচ্ছে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অপরিহার্য অংশ। যদি জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারেন তাহলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বই হুমকির মুখে পড়বে।’ ড. কামাল হোসেন দেশবাসীকে ১৯৭১ সালের মতো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু হয় সেজন্য পাহারা দিতে হবে। জনগণই দেশের মালিক তাদেরই ভোট কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে।’

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ড. কামাল হোসেনের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। এতে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন কেন্দ্র করে আমরা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ দেশ ও সরকারের ওপর তাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে। নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দেয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঐক্যফ্রন্টের সব দলই এ ব্যাপারে সচেতন। যাচাই-বাছাইয়ের পর দেশের সব আসনেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একক প্রার্থী নির্ধারিত হবে।’

ড. কামাল বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য দেশের জনগণ ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ করব। নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমার আহবান তারা যেন নিরপেক্ষভাবে, স্বাধীনভাবে এবং ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে তাদের দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারসহ সব কর্মকর্তার প্রতি আমাদের অনুরোধ আপনারা দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে নিজ নিজি দায়িত্ব পালন করুন। পোলিং এজেন্টরা যাতে নির্ভয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন সে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করুন।’

তিনি বলেন, ‘২০২১ সালে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আগে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন আমাদের দেশ ও জাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মানুষ এই গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে। আশা করি, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং নির্বাচন কমিশন সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালনের ফলে আমরা একটি সুন্দর নির্বাচন পাব। এই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ঐক্যফ্রন্টসহ সব প্রার্থীর প্রতি আমার শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা রইল।

সংবিধানে জনগণের মালিকানার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেশের মালিক জনগণ। তারা যদি ঠিকমতো তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন না করে, সেজন্য পুরো জাতি সুশাসন থেকে বঞ্চিত হবে। সংবিধানের শাসন এবং মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত হবে। এজন্য দায়িত্ব মনে করে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা চাই জনগণ সক্রিয়ভাবে দেশ শাসনের ব্যাপারে অংশগ্রহণ করুক। শুধু একদিনে ভোট দিয়ে দায়িত্ব শেষ নয়। সৎ ও যোগ্য লোককে নির্বাচন করুন- এটাও আপনাদের দায়িত্ব।’

ড. কামাল হোসেন বলেন, অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন এটা শুধু দয়া বা অনুগ্রহের ব্যাপার নয়। এটা সংবিধানের প্রতিশ্র“তি। আমাদের সংবিধানে আছে জনগণ দেশের মালিক। সেই মালিকানা প্রয়োগ করবে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। সেই বিষয়টি ২ তারিখ থেকে ২৮ দিন জনগণকে জানাতে হবে। আমি এ ব্যাপারে নাগরিক ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাচ্ছি। যাতে সঠিক তথ্য জনগণ জানতে পারে সেজন্য গণমাধ্যমের বিশেষ ভূমিকা থাকতে হবে। প্রতিদিনের তথ্য দিন, যেখানে আইন লঙ্ঘন হচ্ছে সেটা জানান, আইন অমান্য করলে তা ধরিয়ে দেয়া গণমাধ্যমের দায়িত্ব।’

তিনি বলেন, ‘অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হলে তার জন্য পরিবেশ দরকার। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য হচ্ছে সুষ্ঠু পরিবেশ। সেটা আমরা বারবার ভুলে যাচ্ছি। সুষ্ঠু পরিবেশের পরিপন্থি হচ্ছে পাইকারি হারে গ্রেফতার। এটা চলছে, এটা সুষ্ঠু পরিবেশ নয়।’

ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘তফসিল ঘোষণার পর ৭শ’র ওপরে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন প্রার্থীও আছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, কাউকে গ্রেফতার করা হবে না। প্রধানমন্ত্রীও বলেছিলেন। আমার কথা হল স্বাভাবিক পরিবেশ রাখার জন্য এই গ্রেফতার বন্ধ করা হোক। যাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, বিশেষ করে যারা প্রার্থী তাদের মুক্তি দেয়া হোক।’ এ সময় সাংবাদিকদের কাছে বিএনপির দেয়া একটি গ্রেফতারের তালিকা সরবরাহ করা হয়।

গ্রেফতার বন্ধ না হলে বৃহত্তর কর্মসূচির হুশিয়রি : সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য, দেশনেত্রী খালেদা জিয়াসহ বন্দি নেতাকর্মীদের মুক্ত করার জন্য। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পরও গায়েবি মামলায় শত শত নেতাকর্মীকে আটক করা হচ্ছে। যারা প্রার্থী হচ্ছেন, আগে এমপি ছিলেন তাদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কখনই তৈরি হবে না। সেজন্য আমরা দাবি করছি, গ্রেফতার বন্ধ করা হোক, গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দেয়া হোক. মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হোক। তা না হলে এই নির্বাচন কখনই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আমরা আশা করব, ড. কামাল হোসেনের এই সংবাদ সম্মেলনের পরই গ্রেফতার বন্ধ হবে। অন্যথায় নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু করার জন্য আমরা বৃহত্তর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।’

সংবাদ সম্মেলনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সুলতান মো. মনসুর আহমেদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিএনপির আবদুস সালাম, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এসএমএস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়াসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রিয় পাঠক, আপনিও হতে পারেন আওয়ার বাংলা অনলাইনের একজন সক্রিয় অনলাইন প্রতিনিধি। আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা, অপরাধ, সংবাদ নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুনঃ [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :