বিমানের লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়

  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৪:৪৭ এএম, ০৪ মার্চ ২০১৯

দেনা ৩০ হাজার কোটি টাকা

প্রতিষ্ঠার ৩৫ বছরেও লাভের মুখ দেখেনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। কোম্পানিতে রূপান্তর হওয়ার পর ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে লাভ হতে শুরু করলেও এখনও ৩০ হাজার কোটি টাকার দেনা টানতে হচ্ছে বিমানকে।

উড়োজাহাজ বাড়লেও আন্তর্জাতিক গন্তব্য কমে এসেছে বিমানের- আগে ২৯টি আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল করলেও এখন ফ্লাইট পরিচালনা করছে ১৫টি রুটে। আর এই পরিস্থিতির জন্য বিমানের ভেতরে জেঁকে বসা দুর্নীতিকেই দায়ী করেছেন সংশ্নিষ্টরা।

ধারাবাহিক লোকসানের সময় বলা হতো, লুটপাট ও পুরনো উড়োজাহাজ ডিসি-১০-এর কারণে বিমান লাভের মুখ দেখতে পারছে না। এ জন্য দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০০৭ সালে বিমানকে কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয়। এর পর ২০০৭ ও ২০০৮ সালে লাভের মুখ দেখার পর আবারও লোকসানে পড়ে কোম্পানি। টানা পাঁচ বছর লোকসানে থাকার পর ২০১৪-১৫ অর্থবছর বিমান ৩২৪ কোটি টাকা লাভ করে। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ সালে বিমান মুনাফা করে ১৮৭ কোটি টাকা। যাত্রীও বেড়েছে বিমানের। বছরে প্রায় ২০ লাখ যাত্রী বিমানে ভ্রমণ করেন।

পুরনো উড়োজাহাজ ডিসি-১০-এর জায়গায় বর্তমানে বিমানবহরে রয়েছে ১৩টি অত্যাধুনিক বোয়িং উড়োজাহাজ। এর মধ্যে বোয়িংয়ের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির চারটি ব্র্যান্ড নিউ বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর ও দুটি ব্র্যান্ড নিউ বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্রাফট। সম্প্রতি বিমানের বহরে বিশ্বের অত্যাধুনিক দুটি ড্রিমলাইনারও যুক্ত হয়েছে। শিগগিরই আসবে আরও দুটি ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ। বর্তমানে বিমানবহরে রয়েছে লিজে আনা পাঁচটি ড্যাস উড়োজাহাজ। যদিও আন্তর্জাতিক গন্তব্য কমেছে বিমানের।

এদিকে, বিমানের লাভ প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারী খেয়ে ফেলছে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি ও উড়োজাহাজ কেনাকাটায় দুর্নীতি এবং হজ মৌসুম ও অন্যান্য কারণে লিজ-বাণিজ্যের নামে পুকুরচুরিতে নাকাল হয়ে পড়েছে বিমান। জিএসএ নিয়ে দুর্নীতি, উচ্চ বেতনে পাইলট ও বিদেশি এমডি নিয়োগ তো আছেই; একটি ই-মেইলের জবাব না দেওয়ায় শতকোটি টাকা জরিমানাও গুনতে হয় বিমানকে। ২০১৪ সালে মিসর থেকে লিজে আনা দুটি বিমান দুই মাস পরই বিকল হয়। অথচ লিজের শর্ত অনুযায়ী, বছরে ১২০ কোটি করে টাকার লোকসান গোনে বিমান। এ দুই বিমানে প্রায় পাঁচ বছরে বিমান প্রায় হাজার কোটি টাকার লোকসান গুনেছে। সূত্রমতে, এসব বিমান নিয়ে লিজ-বাণিজ্য হয়েছে। বিমানের লাভের গুড় এভাবে পিঁপড়ায় খায় বলেই গত পাঁচ বছরে এককভাবে হজযাত্রী পরিবহন করে লাভ করার পরও ৩০ হাজার কোটি টাকার দেনায় ধুঁকছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটি।

১৯৮৪ সালে ডিসি-১০ কেনার ঋণের ২২২ কোটি টাকা এখনও বকেয়া রয়েছে বিমানের। ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ৩০০ কোটি টাকার ঋণও পরিশোধ করতে পারেনি বিমান। বোয়িং কোম্পানির পাওনা পরিশোধের জন্য গত ১০ বছরে রাষ্ট্র ও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে বিমান। সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বিমানের কাছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা পায়। বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিল বাবদ বিমানের দেনা প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পাওনা আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাকিতে আর প্রতিষ্ঠানটিকে জ্বালানি তেল (জেট ফুয়েল) সরবরাহ করা হবে না বলে জানিয়েছে বিপিসি।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি বিমানকে দ্রুত পাওনা পরিশোধ ও নগদ মূল্যে জ্বালানি তেল সংগ্রহের কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিমানকে জেট ফুয়েল সরবরাহ করতে গিয়ে বিপিসির অধীন পদ্মা অয়েল লিমিটেড কোম্পানিকে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি তেল বিক্রির টাকায় বিমানের বকেয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা হচ্ছে। বকেয়া পরিশোধ করতে হলে বিমানকে প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা করে শোধ করতে হবে।

এ বিষয়ে শিগগিরই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এমডি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, বিপিসি ও পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক চিঠিতে সমন্বয় সভা করে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, হজ মৌসুমে বিমান হজযাত্রী পরিবহন করে লাভ করলেও পদ্মা অয়েলের টাকা শোধ করছে না। এভাবে প্রতিবছর বকেয়ার পরিমাণ বাড়ছে। বিপিসি ও পদ্মা অয়েল ২০১৬ সাল থেকে প্রায় তিন মাস পরপর বিমানকে সতর্কতামূলক চিঠি দিলেও বিমান তা আমলে নিচ্ছে না। বিমান মন্ত্রণালয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিমানের লাভের টাকা কোথায় যাচ্ছে, কোন পিঁপড়ায় খাচ্ছে।

পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমান সমকালকে বলেন, বিশেষ বিবেচনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিমানকে জেট ফুয়েল সরবরাহ করা হয়। এ দুটিই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। সরকারের একটি প্রতিষ্ঠানকে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ও সামর্থ্য বুঝতে হবে। পদ্মা অয়েল ব্যাংকঋণ নিয়ে কত দিন সুদ টানবে? তিনি বলেন, আশা করছি, উচ্চ পর্যায়ের সমন্বয় কমিটি শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান দেবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অর্থ বিভাগের নিয়ন্ত্রক মনজুর ইমাম জানান, বিমান প্রতি মাসে বিপিসির মাধ্যমে পদ্মা অয়েল থেকে গড়ে ৫০-৬০ কোটি টাকার জ্বালানি তেল নিয়ে থাকে। বিমান কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে মোট মূল্যের এক-চতুর্থাংশ টাকা পরিশোধ করে আসছে। বকেয়া টাকা পরিশোধের ব্যাপারে বিমান বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ হবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম মোসাদ্দেক আহমেদ সমকালকে বলেন, বিমান আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই লাভের টাকা দিয়ে সব দেনা মেটাতে পারবে বলে আশা করছি। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বিমান এখন ভালো চলছে। সেবার মান বেড়েছে। বিপিসির জেট ফুয়েলের দেনাও পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হচ্ছে। এ বিষয়ক সমন্বয় সভায় বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, সব দুর্নীতি-অনিয়ম দূর করে বিমানকে লাভজনক করা হবে। বিমানে শুদ্ধি অভিযান চালানো হচ্ছে। মিসর থেকে লিজে আনা নষ্ট উড়োজাহাজ ও লিজ-বাণিজ্য আর চলবে না। প্রতিবছর লাভের টাকা দিয়ে বিমানের ঋণ শোধ করা হবে। জ্বালানি তেলের বিষয়েও একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিমানকে ঢেলে সাজানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। এরই মধ্যে বিমানের লিজ ও ভাড়া-বাণিজ্য, কেনাকাটায় অনিয়ম, লাগেজ কাটা, নিয়োগ-বাণিজ্য, কার্গো টার্মিনালের সিন্ডিকেট ও সংশ্নিষ্ট দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। অচিরেই বিমান একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

আপনার মতামত লিখুন :