বিএনপির দুই জোট: জামায়াতকে সর্বাধিক আসনে ছাড়

  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৪:১৩ পিএম, ০২ ডিসেম্বর ২০১৮

বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুই জোটের আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

জাতীয় ঐক্যফন্ট ও ২০-দলীয় (সম্প্রসারিত ২৩ দল) জোটের শরিক ২৭ দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসন পাচ্ছে জামায়াত।

দলটিকে ২৫ আসনে ছাড় দিচ্ছে বিএনপি, এটি মোটামুটি নিশ্চিত। বিএনপি ও জামায়াতের একাধিক সূত্র বিষয়টি স্বীকার করেছে।

জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন বণ্টন নিয়ে জটিলতা কাটেনি বিএনপি জোটে।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুটি জোটের নীতিনির্ধারকরা এখনও নির্ধারণ করতে পারেনি কোন দল কতটি আসনে নির্বাচন করবে।

দুই জোটের ২৭ দলের মধ্যে শুধু জামায়াতের আসনগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাকি ২৬ দলের আসন বণ্টন ঝুলে আছে।

জোটের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০-দলীয় জোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে সমঝোতা হয়ে গেছে, বিএনপি এমন দাবি করলেও আদতে তা হয়নি।

২০ দলের মধ্যে শুধু জামায়াতের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা হয়েছে বিএনপির। অন্যদের সঙ্গে চলছে দরকষাকষি। তাই জোটের শরিকরা যেসব আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে, বিএনপিও সেগুলোতে জমা দিয়েছে।

এমনকি যেসব আসন জোটের শরিকদের নিশ্চিত করা হয়েছে, সেসব আসনেও বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়েছে।

কোনো কোনো আসনে একাধিক প্রার্থীও জোটের নেতাদের পাশাপাশি ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।

২০-দলীয় জোট

বিএনপি চাইছে-২০ দলকে ৩০-৩৫ আসন দিয়ে সন্তুষ্ট রাখতে। কিন্তু ২০ দলের শরিকদের চাহিদা ৪৫-৫০ আসন।

আওয়ামী লীগ শরিকদের ৭০ আসনে ছাড় দেয়ায় বিএনপি শরিকদের চাহিদাও বড় হয়েছে। বিএনপি শুরুতে ২০-৪০ আসনে ছাড় দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

কিন্তু সমীকরণ পাল্টে যায় যখন, শেষ দিকে এসে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী তালিকা লম্বা হয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে এখন পরিকল্পনামাফিক ১৫-২০ আসন দিয়ে সন্তুষ্ট রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

তাই ২০ দলকে কিছু আসনে কম দেয়ার কথা ভাবছে বিএনপি। যদিও দলটির নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে এখনই মুখ খুলতে চাচ্ছেন না।

তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি দুই জোটের শরিকদের ৬০টির বেশি আসন দেবে না এটি মোটামুটি নিশ্চিত।

দুদিন আগে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল এক সংবাদ সম্মেলনে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০-দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টকে সর্বোচ্চ ৬০ আসন দেয়া হবে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, সে ক্ষেত্রে ২০ দলকে ৪০ আসন আর ঐক্যফ্রন্টের জন্য বরাদ্দ থাকছে ২০ আসন।

জানা গেছে, বিএনপি দুই জোটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসন দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামীকে। দলটিকে ২৫ আসনে ছাড় দেয়া হয়েছে। জোটের মধ্যে জামায়াতের আসনই নিশ্চিত। অন্যরা দোটানায় রয়েছে।

জামায়াত ধানের শীষের প্রতীকে ২৫ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। স্বতন্ত্র হিসেবে আরও ২০ আসনে তারা প্রার্থী দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদের সদস্য এহসানুল মাহবুব জুবায়ের যুগান্তরকে বলেন, আমরা ৪৫ আসনে মনোয়নপত্র জমা দিয়েছি। জোটের পক্ষ থেকে আমাদের ২৫ আসনে ছাড় দেয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি আসন আমাদের চাহিদা রয়েছে। তাই কৌশলগত কারণে আমরা বেশ কয়েকটি আসনে স্বতন্ত্র মনোনয়পত্র জমা দিয়েছি। চূড়ান্ত সমঝোতা হলে বাকিগুলো প্রত্যাহার করা হবে।

জানা গেছে, আসন সমঝোতা না হওয়ায় যে যার মতো করে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। জোটের শরিকদের যেসব আসনে ছাড় দেয়া হয়েছে, এর মধ্যে অনেক আসনে বিএনপির প্রার্থীও রাখা হয়েছে।

কোথাও কোথাও জোটের দুই শরিককে ছাড় দেয়া হয়েছে। পিরোজপুর-২ আসনে জোটের শরিক জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী ও লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানকে ধানের শীষে মনোনয়ন দেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাকে ছাড় দেয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

জোটের আরেক শরিক এলডিপি ১০ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের তিনটি আসন দেয়া হবে বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

কিন্তু এলডিপি চাচ্ছে ন্যূনতম পাঁচ আসন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দরকষাকষি চলছে।

খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে ১৭টি আসনে মনোনয়পত্র জমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিএনপি তাদের মাত্র একটি আসনে ছাড় দিয়েছে। এটি জানার পরও তারা অনেক আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছে মূলত দরকষাকষির জন্য।

জোটের শরিক জাগপা দলীয়ভাবে সাতটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে একটির বেশি আসন ছাড় দেয়া হবে না।

এ প্রসঙ্গে জাগপার সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুৎফর রহমান জানান, আমরা দলীয়ভাবে সাতটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। বিএনপি যে কটি আসনে ছাড় দেবে সেগুলো রেখে বাকি আসনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা হবে।

কল্যাণ পার্টি বেশ কয়েকটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। কিন্তু দলটির সভাপতি ইব্রাহিম বীরপ্রতীককে চট্টগ্রামের একটি আসন দিতে চাইছে বিএনপি।

বিজেপির সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ ভোলা-১ আসনে জোটের মনোনয়ন পাচ্ছেন এটি মোটামুটি নিশ্চিত।

জাতীয় পার্টিকে (কাজী জাফর) পাঁচটি আসনে মনোনয়নের চিঠি দেয়া হয়েছে। তারা হলেন- দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান টিআই ফজলে রাব্বি (গাইবান্ধা-১), মোস্তফা জামাল হায়দার (পিরোজপুর-১), এসএমএম আলম (চাঁদপুর-৩), আহসান হাবীব লিংকন (কুষ্টিয়া-২) ও সেলিম মাস্টার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩)। তবে শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টিকে দুটি আসন দেয়া হতে পারে।

জোটের শরিকদের মধ্যে নড়াইল-২ এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে সাম্যবাদী দলের সাঈদ আহমেদকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে ২০ দলের এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে দরকষাকষি চলছে। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু জামায়াত। তারা ২৫ আসন পেয়ে ভেতরে ভেতরে খুশি। তবে অন্য দলগুলো দরকষাকষি চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপির সঙ্গে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

জাতীয় ঐকফ্রন্টের শরিক দলগুলোকে বিএনপি কয়টি আসনে ছাড় দেবে সেটিও ঠিক হয়নি। এ কারণে নিজ নিজ দল থেকে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে জোটভুক্ত দলগুলো।

বিএনপি ছাড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলো ২৪০ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।

এর মধ্যে সর্বাধিক ১০০ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে গণফোরাম।

জেএসডি জমা দিয়েছে ৬০ আসনে। নাগরিক ঐক্য ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ জমা দিয়েছে ৪০টি করে আসনে।

২৪০ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও বিএনপির কাছ থেকে সম্মানজনক আসন পেতে দরকষাকষি করছে ঐক্যফ্রন্টের শরিক চার দল।

বিএনপির পক্ষ থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সর্বোচ্চ ২০ আসনে ছাড় দেয়া হতে পারে। এ নিয়ে ফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেও কোনো সমঝোতা হয়নি।

ফ্রন্টের শরিক নাগরিক ঐক্য ৯টি আসনে ধানের শীষ নিয়ে মনোনয়ন জমা দিয়েছে। তবে চূড়ান্তভাবে এ দলটিকে সর্বোচ্চ দুটি আসনে ছাড় দেয়া হতে পারে।

ওই দুটি আসন হচ্ছে-মাহমুদুর রহমান মান্নাকে বগুড়া-২ আসন আর এসএম আকরামকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সারা দেশে দলীয়ভাবে ৪০ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কাদের সিদ্দিকীকে সর্বোচ্চ দুটি আসনে ছাড় দেয়া হতে পারে।

এর মধ্যে কাদের সিদ্দিকী রাজী থাকলে ঢাকার একটি আসন দেয়া হতে পারে। নতুবা টাঙ্গাইল-৪ আসনে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে। তার দলের যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকীকে গাজীপুর-৩ আসনটি দেয়া হতে পারে।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী যুগান্তরকে বলেন, দলীয়ভাবে আমরা ৪০ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। তবে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক বিএনপির সঙ্গে যেসব আসনে সমঝোতা হবে, সেগুলো রেখে বাকি প্রত্যাহার করা হবে।

ফ্রন্টের আরেক শরিক জেএসডি দলীয়ভাবে ৬০টি মনোনয়পত্র জমা দিয়েছে। তবে তাদের সর্বোচ্চ দুটি বা তিনটি আসনে ধানের শীষ দেয়া হতে পারে।

জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রবকে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে আর তানিয়া রবকে ঢাকার একটি আসন দেয়া হতে পারে। দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতনকে কুমিল্লার একটি আসন দিতে পারে বিএনপি।

এ প্রসঙ্গে দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, ফ্রন্টের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে বাকি আসনের মনোনয়ন প্রত্যাহার করা হবে।

গণফোরামের পক্ষ থেকে সারা দেশে শতাধিক আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে গণফোরাম ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রার্থীদের সর্বোচ্চ ১২-১৫ আসনে ছাড় দেয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে।

গণফোরাম ১৫ আসন পেলে দুই জোটের মধ্যে জামায়াতের ২৫ আসনের পর গণফোরামই সর্বোচ্চ আসন পাচ্ছে।

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল নির্বাচন করছেন না। তার দল থেকে যারা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারেন, তারা হলেন-মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, রেজা কিবরিয়া, আবু সাইয়িদ প্রমুখ।

জোটের আসন বণ্টন নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ২০-দলীয় জোটের শরিক ও ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আসন নিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে। ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। এ নিয়ে কোনো সংকট হবে না।

তিনি আরও বলেন, সময় স্বল্পতার কারণে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার আগে আসন ভাগাভাগি চূড়ান্ত করা হয়নি। আশা করি প্রত্যাহারের আগে এ ব্যাপারে আমরা একটা সমঝোতায় আসতে পারব।

প্রিয় পাঠক, আপনিও হতে পারেন আওয়ার বাংলা অনলাইনের একজন সক্রিয় অনলাইন প্রতিনিধি। আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা, অপরাধ, সংবাদ নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুনঃ [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :