দূষণের আঁধারে মলিন আকাশ

  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৩:৫০ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮

শীত শহরে ছুঁই ছুঁই করছে। গ্রামে জেঁকে বসেছে। শীত মানেই সাধারণত বৃষ্টিহীন দিনরাত। আর বৃষ্টিহীন মানেই ধুলোয় ধূসর শহর, গ্রামও বাদ যায় না। চারদিকে বৈধ-অবৈধ ইটভাটার আধিপত্য। শীতের কুয়াশার সঙ্গে ইটভাটার কালোধোঁয়া মিলেমিশে পেনসিলরঙা আকাশ। স্বচ্ছ নীল আকাশ রাজধানীর আশপাশে দেখা মেলা ভার। গবেষণার ফলাফলে জানা যায়, শীত মৌসুমে ঢাকা শহরের বস্তুকণা বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা ৫৮ শতাংশ দায়ী। এ ইটের ভাটা থেকে ক্রমাগত নির্গত কালোধোঁয়ায় পরিবেশ বিষাক্ত করে তোলে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর বড় শহর বা রাজধানীর আশপাশে শহরাঞ্চল বা গ্রামাঞ্চলে চলাচল করলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন কেড়ে নেয়। আর ঢাকার আশপাশে গেলে চোখে পড়ে ইটের ভাটা ও কালোধোঁয়ার দূষিত বায়ু। এক নয়, শতাধিক। শুধু কালোধোঁয়া উদগ্রীরণ হচ্ছে। ভাটা থেকে নির্গত ছাই ও ধোঁয়া মূলত কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড ও সালফার ডাই অক্সাইডের উৎস, যা মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। চর্মরোগ, হৃদরোগ, প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়া, স্ট্রোক, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, ক্যান্সার, অ্যাজমাসহ বিভিন্ন জটিল ও কঠিন রোগ হয়ে থাকে বায়ুদূষণ থেকে। শুধু বায়ুদূষণের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষ মারা যায়। আর বছরে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই সাড়ে তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। বোস্টনভিত্তিক হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউটের বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি ২০১৭ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষিত শহর হল দিল্লি আর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা।

প্রধানত মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট ক্ষতিকর ও বিষাক্ত পদার্থের দ্বারা বায়ুমণ্ডেলর দূষণ হয়। বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলো হল- গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া, বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্র থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া, শিল্পকারখানা এবং কঠিন বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া। ইটের ভাটা, সার কারখানা, চিনিকল, কাগজ কল, পাটকল, বস্ত্র কারখানা, স্পিনিং মিল, ট্যানারি শিল্প, গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি, রুটি ও বিস্কুট কারখানা, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্প, সিমেন্ট কারখানা, মেটাল ওয়ার্কশপ ইত্যাদি শিল্প কারখানা দ্বারা বায়ুদূষিত হয়।

আমাদের দেশে অধিকাংশ ইটভাটা খোলা জায়গায়। ইট বহনে ট্রলি-ট্রাকও ব্যবহার করে ঢাকনা ছাড়াই। ফলে সহজেই ধুলাবালি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বাতাসে ভারি ধাতু বৃদ্ধি পায়, ধোঁয়ার মেঘ সৃষ্টি হয়ে সূর্যের আলো কমে যায়। ইটের ভাটার কারণে হাজার হাজার একর জমির ওপরের উর্বর মাটি পোড়ে। শুধু উর্বর জমি নষ্ট নয়, ইটভাটা থেকে যে দূষিত গ্যাস ও তাপ নির্গত হয় তা আশপাশের জীবজন্তু, গাছপালা এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে। আবার জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমেও বায়ুদূষিত হয়।

প্রতি বছর শীত মৌসুমে ধুলোবালি বেড়ে যায়। মানুষ সচেতন হলে বায়ুদূষণ বন্ধ করা সম্ভব না হলেও কমানো সম্ভব। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশবান্ধব ইটভাটা গড়ে তুলতে হবে। আইনের কঠোরতার মাধ্যমে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করতে হবে। কৃষি জমির উপরিস্তর দিয়ে ইট বানানো বন্ধ করতে হবে। মাটির ইটের বিকল্প হিসেবে যেসব উপকরণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়েছে, তার ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকারের যেসব বিভাগ অবকাঠামো নির্মাণ ও তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদেরও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। সবার সচেতনতাই পারে বায়ুদূষণ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে।

আপনার মতামত লিখুন :