তারা আর সেই খারাপ মানুষটি নেই, তারা এখন…

  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৬:০৬ এএম, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮

বিষণ্ণ মনে সোফায় বসে পেপার পড়ছিলেন বাবা। ক্লাস নাইনে পড়া ছেলেটা পাশে এসে বলল, ‘ভাই, আপনার কি মন খারাপ?’

বাবা ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন সোফা থেকে। ঠাস করে ছেলের গালে একটা থাপ্পড় মেরে বললেন, ‘শয়তান, বাবাকে কস ভাই!’

গাল হাতাতে হাতাতে ছেলে বলল, ‘আমার কী দোষ, অভ্যাস হয়ে গেছে না! গত এক মাস তোমার নামে মিছিল করেছি। মিছিলে তো কখনও বলা হয় না- তোমার বাবা আমার বাবা, আক্কাস বাবা আক্কাস বাবা। মিছিলে কয়- তোমার ভাই আমার ভাই, আক্কাস ভাই আক্কাস ভাই।’ ছেলে দুঃখী দুঃখী গলায় বলল, ‘বাবাকে ভাই বলে ডাকলাম পুরা একটা মাস, তাও যদি ভোটে জিততে পারতা!’

নির্বাচন এলেই সবকিছু পাল্টে যায় চারপাশে। বাবা হয়ে যায় ভাই, সারাবছর দাপট দেখানো সন্ত্রাসীরা হয়ে যায় বিনয়ী, ভোটে দাঁড়ানো মানুষটা হয়ে যায় ফেরেশতা।

ভোটে দাঁড়ানো এ রকম একটা নেতা গেছেন এক বাড়িতে; ভোট চাইতে। সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। দরজা খুলেই ভোটার বাড়িওয়ালা দেখলেন, পুরো পাঁচ বছর পর সামনে দাঁড়ানো মানুষটার সঙ্গে দেখা তার। রাগে জ্বলে গেল বুকের ভেতর, মনের ভেতর জাগল অন্য রকম একটা সাধ। চমকে ওঠার মতো চোখ বড় বড় করে বাড়িওয়ালা বললেন, ‘ভাই, আপনার গালে তো মস্ত বড় একটা মশা বসেছে। কামড় দিলে ডেঙ্গু হবে তো।’ বলেই নেতার বাঁ গালে দিলেন জোরসে একটা থাপ্পড়। নেতা সঙ্গে সঙ্গে ভোটারের হাতটা চেপে ধরে বললেন, ‘যাক, ডেঙ্গু হওয়া থেকে আপনি আমাকে বাঁচালেন; এবার একটা ভোট দিয়ে আমার সম্মান বাঁচান।’

নেতা হতে গেলে বুদ্ধি লাগে, কিন্তু নেতা হলেই সেই বুদ্ধি আর ব্যবহার করা হয় না। না হলে আমাদের দেশে নেতাদের এমন অবস্থা, আমাদের আম-পাবলিকেরও এমন দুরবস্থা।’

ভিনগ্রহ থেকে একজন মানুষ এসেছেন একটা লাশকাটা ঘরে। একটা মাথা দরকার তার। নিজের গ্রহে গিয়ে পৃথিবীর মাথা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ইচ্ছে তাদের।

ডোম তিনটে মাথা দেখিয়ে বললেন, ‘প্রথমটার দাম এক হাজার টাকা, দ্বিতীয়টার চার হাজার আর তৃতীয়টার দাম পুরো দশ হাজার।’

ভিনগ্রহের মানুষটা অবাক হয়ে গেলেন, ‘একই মাথা, কিন্তু তৃতীয়টার দাম এত বেশি কেন?’

‘কারণ, এটা একটা রাজনীতিবিদের মাথা। সারাজীবন এটা দিয়ে মানুষের খারাপ করার চিন্তা করা হয়েছে। কিন্তু ভালো চিন্তার অংশটাও রয়ে গেছে এখনও। ভালো অংশটা যেহেতু অব্যবহূতই রয়ে গেছে, তাই এর দামটা একটু বেশি।’

নির্বাচন এলেই প্রথম আসে নেতার চরিত্রের প্রসঙ্গ- জুলমত ভাইয়ের চরিত্র, ফুলের মতো পবিত্র। এ রকম একটা দেয়াল লিখনে কে যেন ফুলের আগে একটা শব্দ লিখে দিলেন- ধুতরা। তাই দেখে জুলমত ভাই গেলেন ক্ষেপে। চরিত্র অনুযায়ী গালিগালাজ করলেন একে ওকে। পরের দিন বাসার বাইরে এসে দেখলেন, তার নামের চারটা অক্ষর থেকে একটা অক্ষর নেই- জুলুমত থেকে ‘ত’ অক্ষরটা মুছে দেওয়া হয়েছে আলকাতরা দিয়ে। সব জায়গায় জ্বলজ্বল করছে- জুলুম ভাই কিন্তু, গরিবের বন্ধু।

চরিত্রের প্রসঙ্গ যখন এলোই, তাহলে আরও একটা ঘটনা বলা যাক। এক লোক গেছেন এক কাউন্সিলরের বাড়িতে। চাকরি-সংক্রান্ত একটা চারিত্রিক সার্টিফিকেট দরকার তার। কিন্তু তিনি শুনলেন, নেতা জেলে। লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, ‘জেলে কেন?’ বাড়ির কেয়ারটেকার বিরস বদনে বললেন, ‘রেপ কেসে।’

নমিনেশন নিয়ে অনেক কিছুই হয়ে গেছে কয়দিন আগে। আসলে নমিনেশন পাওয়ার যোগ্য কারা? খালেদ ইশতিয়াক নাদিম নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন- Nomination শব্দটা Elaboration করলে আমরা পেয়ে যাব Qualification বা যোগ্যতার বয়ান।

N- Nasty Politics | O- Oil Machine | M- Muscle Man | I- Idiot. N- Non-sense | A- Arms | T- Terrorist | I- Immoral | O- Oppressor | N- Notorious. সব মিলিয়ে নমিনেশন!

ওপরের শব্দগুলোর বাংলা করা হলো না। দুটো কারণে- এক. ওই সব বাংলা শব্দে আমরা খুব লজ্জা পাব। দুই. যাদের নিয়ে এই শব্দগুলো ব্যবহার করা হলো, তাদের অনেকেই অশিক্ষিত। তারা এই ব্যাপারটা বুঝবেন না, তাই ঝামেলাও হবে না। কেউ কেউ সেই অশিক্ষিতকা ঢাকতে নিজেকে বলেন বা লিখেন- স্বশিক্ষিত। আহারে, দেশে যদি এত স্বশিক্ষিত আরজ আলী মাতুব্বর থাকতেন!

নির্বাচন এলেই আরও একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়- ডিগবাজি। এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে, তোদের নেতার পোস্টারে মার্কা কই?’

দ্বিতীয় বন্ধু উত্তর দিল, ‘খালি রেখেছি।’

‘কেন?’

‘আমাদের নেতার ডিগবাজি মারা এখনও শেষ হয়নি।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাকিয়াভেলি বলেছিলেন, ‘প্রতিটি প্রতিশ্রুতির মাঝেই অন্তত একটা মিথ্যা লুকিয়ে আছে।’ আর ‘অধিকাংশ রাজনীতিবিদের জন্মই হয়েছে মিথ্যা বলার জন্য।’ সব্যসাচী লেখক হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন এটা।

গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হলো নির্জন এক রাস্তার পাশে, ধানক্ষেতে। ওই গাড়িতে বেশ কিছু রাজনীতিবিদ ও নেতাকর্মী ছিলেন। সবাই আধমরা অবস্থায় পড়ে রইলেন মাটিতে। ড্রাইভার পালিয়ে গেল তাদের ফেলে।

ওই ধানক্ষেতটা ছিল এক কৃষকের। পাশেই তিনি একটা কুঁড়েঘরে থাকতেন। শব্দ পেয়ে কাছে এসে পুরো ব্যাপারটা দেখে বড় একটা গর্ত খুঁড়লেন দ্রুত। তারপর সব নেতাকর্মীকে সেখানে ফেলে মাটিচাপা দিলেন।

অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়ে একদল পুলিশ এলো সেখানে, যথারীতি দুই ঘণ্টা পর। গাড়িটা পড়ে থাকতে দেখলেন তারা, কিন্তু দুর্ঘটনায় পতিত দেখলেন না কাউকে। কিছুটা দূরে ওই কৃষককে কাজ করতে দেখে পুলিশ অফিসার বললেন, ‘এখানে যে কিছু নেতাকর্মী ছিলেন, তারা কোথায়?’

কৃষকের নির্ভার উত্তর, ‘সবাইকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।’

‘বলেন কী!’ পুলিশ অফিসার বিস্ময় প্রকাশ করলেন, ‘তাদের সবাই মারা গেছেন নাকি?’

নির্বিকার গলা এবার বৃদ্ধ কৃষকের, ‘মাটিচাপা দেওয়ার সময় কয়েকজন অবশ্য বলার চেষ্টা করেছিল- তারা মরে নাই। কিন্তু আপনি তো জানেন, যারা রাজনীতি করে, তারা মিথ্যা কথা বলে সারাক্ষণ।’

মেয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, সব মিথ্যা গল্প কি এভাবে শুরু হয়- এক দেশে এক রাজা ছিল…।’

বাবা উত্তর দিলেন, ‘না রে মা। কিছু কিছু মিথ্যা গল্প শুরু হয়- এবার আমি নির্বাচিত হলে…।’

নির্বাচনে কারা দাঁড়ায়? কারা জনপ্রতিনিধি হয়?

উত্তর নিচের গল্পটায় আছে।

রবার্ট জন নামের লন্ডনের এক সাংবাদিককে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হলো- বাংলাদেশে ১০ এলাকার খারাপ মানুষের জীবনবৃত্তান্ত জানতে এবং তা লিখতে। বাংলাদেশে এসে চোর, ছিনতাইকারী, ধর্ষক, দখলবাজ, সন্ত্রাসী, খুনি- এ রকম ১০ জনের সঙ্গে কথা বললেন এবং সে সম্পর্কে লিখে ফিরে গেলেন আবার নিজ দেশে।

সাত বছর পর ওই পত্রিকা থেকে আবার বাংলাদেশে পাঠানো হলো রবার্টকে- ওই খারাপ মানুষদের বর্তমান জীবনবৃত্তান্ত জানতে।

রবার্ট সব এলাকায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, তারা আর সেই খারাপ মানুষটি নেই, তারা এখন…।

প্রিয় পাঠক, শূন্যস্থানে ইচ্ছেমতো শব্দ বসিয়ে নিন।

তারপরও হৃদয় হাহাকার করা কথা হলো- ভোট তো দিতে হবে আমাদের!

দাদু বেশ গর্ব নিয়ে বললেন, ‘আমাদের সময় ভোট দেওয়া কত আরামের ছিল। অল্প মানুষ, ছোট ছোট লাইন, পাঁচ মিনিটেই ভোট দিয়ে আসা যেত।’

নাতি মুচকি হেসে বলল, ‘আমাদের তো আরও আরাম।’

দাদু চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘কীভাবে?’

‘আমাদের তো বাড়ি থেকে বের হয়ে, পয়সা খরচ করে গাড়িতে গিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে হয় না। প্রার্থীর লোকজনই আমাদের ভোটটা নিজ দায়িত্বে দিয়ে দেয়।’ নাতি কথা শেষ করে বলল, ‘দাদু, এবার তোমাকে একটা প্রশ্ন করি- অভিনেতারা শেষ বয়সে নির্বাচনে নামে কেন বলো তো?’

দাদু খিকখিক করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘কারণ রাজনীতিবিদদের মতো বড় অভিনেতা হতে।’

গোপাল ভাঁড় তার পরনের কাপড়টা খুলে, মাথায় বেঁধে, পুরো ন্যাংটো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন চৌরাস্তার মোড়ে। সবাই উৎসুক্য হয়ে তার দিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎ একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘গোপাল, তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন!’

গোপাল উত্তর দিলেন, ‘নমিনেশন চেয়েছি। তাই আলোচনায় আসার জন্য, শীর্ষ নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই ব্যবস্থা নিয়েছি। নমিনেশন পাওয়ার জন্য একেকজন যেভাবে পরোক্ষভাবে দিগম্বর হচ্ছে দেখতে পাচ্ছি, আমি সরাসরি তার প্রত্যক্ষ রূপ দেখাচ্ছি। তা ছাড়া এটা এক ধরনের প্রচারও।’

নমিনেশন পেলেন না গোপাল। দুই সপ্তাহ পর তিনি আবার ন্যাংটো হয়ে রাস্তায় দাঁড়ালেন। তাই দেখে ওই লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবার কেন গোপাল!’

‘সবাই ভোট চাওয়ার জন্য যখন-তখন বাড়ির দরজায় এসে ঠিকমতো ঘুমাতে দেয় না আমাকে। তাই…।’ গোপাল মুচকি হেসে বললেন, ‘কেউ কেউ এমনভাবে এসে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে, তখন ভাবি- হায়, তাদের অনিষ্ট আত্মার ছোঁয়া যদি আমার আত্মায় লেগে যায়!’ গোপাল আরও একটু হেসে নিলেন, ‘এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর কেউ আর কপোট জড়িয়ে ধরে না আমাকে। সর্বাঙ্গে বাতাস লাগিয়ে বেশ আরামে আছি রে, ভাই!’

আপনার মতামত লিখুন :