গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব

  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৩:৫৪ এএম, ১৫ মার্চ ২০১৯

গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ চরমে।

কেননা গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। বাড়াতে হবে পণ্যের দাম। ফলে রফতানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

রফতানি কমারও আশঙ্কা রয়েছে। কমে যাবে প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা। বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বিদেশি ক্রেতারা। অন্যদিকে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে।

কিন্তু আয় না বাড়ায় মানুষ জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করবে। ফলে পণ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে। এতে দেশীয় শিল্প খাতে বড় ধরনের আঘাত আসার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব অনুযায়ী, এবার গ্যাসের দাম গড়ে বাড়ানো হবে ১০২ শতাংশ। অর্থাৎ গ্যাসের নতুন মূল্য হবে বর্তমান মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সব খাতে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোক্তা, উদ্যোক্তা এবং বিদেশি ক্রেতাদের একসঙ্গে এত বেশি মূল্যবৃদ্ধির চাপ নেয়ার সক্ষমতা নেই।

একইসঙ্গে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার ফলে চাপ পড়বে মূল্যস্ফীতির হারে। এই হার বেড়ে গিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় আঘাত আনতে পারে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, শিল্প খাতে মৌলিক কাঁচামালের মতো কাজ করে গ্যাস-বিদ্যুৎ। এগুলোর দাম বাড়লে সব খাতেই ব্যয় বেড়ে যাবে।

ঘন ঘন গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে ব্যবসায়ীদেরকে পণ্যের দাম বাড়াতে হয়। এতে দেশের পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা বিশেষ করে রফতানি বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

একইসঙ্গে মানুষের জীবনমানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ কারণে গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়টি সরকারকে অত্যন্ত সতর্কভাবে বিবেচনা করতে হবে।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দাম বাড়লে শিল্পগু খাতের বিকাশ রুদ্ধ হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। দেউলিয়া হয়ে যাবেন উদ্যোক্তারা। তাদের বক্তব্য, গত ১০ বছরে ৬ বার বেড়েছে গ্যাসের দাম। এমনিতে বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাবে শিল্প খাতে ব্যয় বাড়ছে, তার ওপর বারবার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গ্যাসের মূল্য সহনীয় রাখতে চলতি অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা করছাড় দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক এবং মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বাবদ এ ছাড় দিয়েছে সংস্থাটি। এত করছাড় পাওয়ার পরও গ্যাসের দাম গড়ে ১০২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পেট্রোবাংলার অধীন বিতরণ কোম্পানিগুলো।

এটা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বর্তমানে প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে গ্যাসের মূল্য বাবদ প্রায় ১৪ সেন্ট (১১ টাকা ৭৬ পয়সা) খরচ হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী গ্যাসের দাম বাড়লে এ ব্যয় বেড়ে ২৮ সেন্টের (২৩ টাকা ৮০ পয়সা) কাছাকাছি দাঁড়াবে। তারা বলছেন, বর্তমানে সুতা উৎপাদনের যে খরচ সেটাই উঠছে না। আর গ্যাসের দাম বাড়লে বিদেশি সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কীভাবে টিকবে সেটাই এখন সবার জিজ্ঞাসা। এছাড়া গ্যাসের দাম বাড়লে সব ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে। বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। দাম বাড়বে বিদ্যুতের। বাড়বে পরিবহনের ভাড়া। সব মিলে বাড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়, যার মাশুল গুনতে হবে সাধারণ মানুষকে।

ইতিমধ্যে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির গণশুনানি স্থগিত চেয়ে হাইকার্টে রিট করা হয়েছে। বুধবার রিটের শুনানি শেষ হয়েছে। যদিও এরই মধ্যে গণশুনানি শেষ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে আদেশের জন্য আগামী ৩১ মার্চ দিন ঠিক করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

শুনানিতে গ্যাসের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করে গণশুনানিকে ‘তামাশা’ বলে মন্তব্য করেন রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেছেন, একটা বিশেষ মহলকে সুবিধা দেয়ার জন্যই গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করে গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে। তিতাস কিংবা আরও যেসব সংস্থা আছে তারা কোথাও দাম বাড়ানোর কারণ উল্লেখ করেনি।

এমনকি দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতাও উল্লেখ করেনি। তারা সেখানে ১০ ডলার করে গ্যাস আমদানির কথা বলেছেন। এ সময় আদালত প্রশ্ন করেন, যেখানে ভারত বাইরে থেকে ৬ ডলারে গ্যাস আমদানি করে সেখানে আমরা কেন ১০ ডলারে গ্যাস আমদানি করছি। এ প্রশ্নের কোনো উত্তর পেট্রোবাংলা কিংবা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের পক্ষে কেউ দিতে পারেনি।
এনবিআর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া গণমাধ্যমে বলেছেন, শিল্প-বাণিজ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্বিঘ্ন করতেই গ্যাসের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের কর ছাড় দেয়া হয়েছে। এতে সরকারের বিপুল অঙ্কের রাজস্ব কমলেও মানুষের ভোগান্তি লাঘবে গ্যাসের ক্ষেত্রে শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাটে ছাড় দেয়া হয়েছে। মূলত এলএনজি আমদানির পর যেন গ্যাসের দাম না বাড়ে, সে লক্ষ্য সামনে রেখে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। এনবিআর এক চিঠিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, এ কর অব্যাহতির ফলে চলতি অর্থবছর এনবিআর ১৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। জানা গেছে, এ খাতে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এনবিআরের আহরণ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা কমেছে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ- গ্যাসের ওপর রাজস্বে এ ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। উল্টো পেট্রোবাংলার নির্দেশে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। জানা গেছে, আগামী ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে যে কোনো সময় এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম সমন্বয়ের ঘোষণা দেবে।

মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের পক্ষে পেট্রোবাংলা বলছে, এলএনজি আমদানি ব্যয়ের তুলনায় এনবিআরের করছাড় অপ্রতুল। ফলে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করার বিকল্প নেই। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বলেন, এক হাজার এমএমসিএফডি গ্যাস আমদানিতে এক অর্থবছরে তাদের ঘাটতির পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এ কারণেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এদিকে গ্যাসের এ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়লে ব্যবসায়ীরা গভীর সংকটে পড়বেন।

প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যখন-তখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করা যায় না। তিনি গ্যাসের দাম এত না বাড়িয়ে সরকারকে ভর্তুকি দেয়ার দাবি জানান। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আবেদন করার পর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সবেমাত্র গ্যাস সংযোগ পেতে শুরু করেছে। এ সময় দাম বৃদ্ধি কার স্বার্থে? তিতাসকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনারা ৩৫ শতংশ লভ্যাংশ দিতে চাচ্ছেন কিন্তু ব্যবসায়ীরা তো দু-তিন ভাগও ব্যবসা করতে পারছেন না। তিনি গণশুনানিকে হাস্যকর আখ্যা দিয়ে বলেন, সারা বিশ্বে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে জ্বালানির দাম কমেনি। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, বর্তমানে সুতা উৎপাদনের যে খরচ সেটাই উঠছে না। বিদেশি সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাচ্ছে না। প্রস্তাবিত হারে গ্যাসের দাম বাড়ালে একটি বস্ত্রকলও টিকে থাকতে পারবে না। ধ্বংস হয়ে যাবে টেক্সটাইল খাত। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে গ্যাসের মূল্য বাবদ প্রায় ১৪ সেন্ট (১১ টাকা ৭৬ পয়সা) খরচ হয়। গ্যাসের দাম বাড়লে এ ব্যয় বেড়ে ২৮ সেন্টের (২৩ টাকা ৮০ পয়সা) কাছাকাছি দাঁড়াবে। ইস্পাত খাতের উৎপাদনে গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবহার অনেক বেশি। ব্যবসায়ীদের হিসাবে এক টন রড উৎপাদনে প্রায় সাত হাজার টাকা ব্যয় হয় জ্বালানির পেছনে। প্রস্তাবিত হারে গ্যাসের দাম বাড়লে রড উৎপাদনে ব্যয় আরও সাত হাজার টাকার মতো বাড়তে পারে। বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম বলেন, আগামী দিনগুলোতে ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ আসতে পারে। কারণ, গ্যাসের দাম বাড়বে, ডলারের দাম বাড়ছে। নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন কার্যকর হলে করের চাপও বাড়বে। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ালে পরিবহন, বিদ্যুৎ, পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সব খাতে ব্যয় বাড়বে। এই বাড়তি ব্যয়ের প্রতিটি অর্থ আবার ব্যবসায়ীরা জনগণের কাছ থেকেই পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে আদায় করবেন। ফলে শেষ পর্যন্ত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির মূল্য সাধারণ মানুষকেই দিতে হবে। তিনি বলেন, আগামী এপ্রিলে এলএনজি আসতে পারবে না। এ বিষয়টি সরকার যেমন জানে, বিইআরসিও বোঝে, যেখানে গ্যাসই আসেনি, তাই তার ওপর ভিত্তি করে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ অযৌক্তিক ও অন্যায়।

প্রিয় পাঠক, আপনিও হতে পারেন আওয়ার বাংলা অনলাইনের একজন সক্রিয় অনলাইন প্রতিনিধি। আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা, অপরাধ, সংবাদ নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুনঃ [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :