ইজতেমার আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ, নিহত ১

  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:৪৮ এএম, ০২ ডিসেম্বর ২০১৮

টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার আধিপত্য নিয়ে তাবলিগ জামাতের দু’পক্ষের সংঘর্ষে ইসমাইল মণ্ডল (৬৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তার বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। গতকাল শনিবার টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানের ফটক ও এর আশপাশ এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে কামারপাড়া, স্টেশন রোড, আবদুল্লাহপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থ্থান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দু’পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের সড়কেও। টঙ্গী ও বিমানবন্দরের সামনে সড়ক অবরোধসহ বিক্ষোভ করে তাবলিগ জামাতের দুটি গ্রুপই। এতে দিনভর তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বিকেলে টঙ্গী ও বিমানবন্দর সড়ক থেকে দু’পক্ষ সরে যাওয়ার পর স্বাভাবিক হতে শুরু করে যান চলাচল। এ ঘটনায় গতকাল বিকেলে দু’পক্ষের ‘বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দু’পক্ষকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী এক মাস টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে তাবলিগ জামাতের কোনো পক্ষই প্রবেশ করতে পারবে না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আবার বৈঠক করে বিশ্ব ইজতেমার তারিখ নির্ধারণ করা হবে।’ সংঘর্ষে একজন নিহতের ঘটনায় মন্ত্রী বলেন, ‘এ ঘটনায় ফৌজদারি আইনে মামলা হবে। তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।’ জানা গেছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে তাবলিগ জামাতের অন্যতম শীর্ষ মুরব্বি ভারতের সাদ কান্ধলভীর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এ দেশে তাবলিগ জামাত দু’পক্ষে বিভক্ত হয়ে যায়।

সাদপন্থিদের নেতৃত্ব দেন ওয়াসিফুল ইসলাম এবং সাদবিরোধীদের নেতৃত্ব দেন মাওলানা জোবায়ের আহমেদ। ২০১৭ সালের নভেম্বরে কাকরাইল মসজিদে প্রথম দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর আরও কয়েকবার রাজধানীতে দু’গ্রুপের সংঘর্ষ বাধে।

জানা গেছে, গতকাল সকাল থেকেই সাদপন্থি ও সাদবিরোধীদের মধ্যে টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে উত্তেজনা শুরু হয়। প্রথমে ইজতেমা মাঠের সব ফটকে কড়া পাহারা বসায় সাদবিরোধী নেতা জোবায়েরের অনুসারীরা। ময়দানে ঢুকতে না পেরে সাদপন্থিরা কামারপাড়া এলাকায় সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।

এদিকে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সাদপন্থিরা দলে দলে বিমানবন্দর সড়ক দিয়ে ইজতেমা মাঠে যাচ্ছে- এমন খবর পেয়ে সাদবিরোধীরা বিমানবন্দরের সামনের সড়কে বাধা দেয় তাদের। আশকোনার একটি মাদ্রাসার ছাত্ররা সাদবিরোধীদের সঙ্গে যুক্ত হয়। এ সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সাদবিরোধীরা বিমানবন্দরের সামনে গোলচত্বরে উত্তরামুখী সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। সাদপন্থিরা অবস্থান নেয় বলাকা ভবনের সামনের সড়কে। পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে দু’পক্ষই অবস্থান করে সড়কে। সকাল থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সড়কের একপাশ বন্ধ থাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। তবে মাঝেমধ্যে দু-একটি গাড়ি চলার সুযোগ করে দেয় পুলিশ। সাধারণ পথচারী ছাড়াও বিদেশগামী ও বিদেশফেরত যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন।

বিমানবন্দর থানার ওসি নুরে আজম মিয়া জানান, তাবলিগ জামাতের দুটি গ্রুপের মুখোমুখি অবস্থানে বিমানবন্দর সড়ক এলাকায় হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিমানবন্দর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তারা সড়ক থেকে চলে যাওয়ার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

তাবলিগসংশ্নিষ্টরা জানান, ভারতের তাবলিগ জামাতের মুরব্বি সাদ কান্ধলভীর অনুসারীরা বিশ্ব ইজতেমা মাঠে ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ দিনের জোড় (সম্মেলন) এবং আগামী ১১-১৩ জানুয়ারি তিন দিনের বিশ্ব ইজতেমা করার ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে সাদবিরোধী মাওলানা জোবায়েরের অনুসারীরা ৭-১১ ডিসেম্বর জোড় এবং আগামী ১৮-২০ জানুয়ারি তিন দিন ইজতেমার ঘোষণা দেয়। তবে বৃহস্পতিবার রাতেই সাদবিরোধীরা ইজতেমা ময়দান দখল করে নেয় এবং ময়দানের গেটে পাহারা বসায়, যাতে সাদপন্থিরা ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্ররা তাদের সঙ্গে যোগ দেয় ওই ময়দানে। তবে জোড় ইজতেমায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সাদপন্থিরা শুক্রবার ময়দানে প্রবেশের চেষ্টা করলে সাদবিরোধীরা বাধা দেয়। পরে তারা আশপাশের মসজিদে অবস্থান নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাদপন্থিরা গতকাল ভোরেও জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠানের জন্য ময়দানে ঢোকার চেষ্টা করে। এ সময় সাদবিরোধীরা বাধা দেয় তাদের। এরপর তারা ইজতেমা ময়দানের এক নম্বর গেটের বাইরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দু’গ্রুপের সংঘর্ষ শুরু হয়। দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত কামারপাড়া, বাটাগেট, স্টেশন রোড, আবদুল্লাহপুরসহ আশপাশে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। তাদের কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে বাঁশ দেখা যায়। ইটপাটকেলও ছোড়ে উভয়পক্ষ। এ সময় দু’পক্ষের দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। ইসমাইল মণ্ডল নামে এক মুসল্লি নিহত হন। তার বাড়ি মুন্সীগঞ্জের মিল্ক্কিপাড়ায়। নিহত ব্যক্তির মাথায় ধারালো কিছু বা লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। নিহত ইসমাইলের ছেলে জাহিদ হাসান জানান, তার বাবা আলুর ব্যবসা করতেন। বাবা-ছেলে গতকাল ভোরে টঙ্গী আসেন ইজতেমা ময়দানে যাওয়ার উদ্দেশে। তার বাবা সাদপন্থি। সাদবিরোধীরা মাঠে অবস্থান করছিল। এ সময় সাদপন্থিরা মাঠে ঢোকার চেষ্টা করলে ধাক্কাধাক্কি ও মারামারি হয়। সাদবিরোধীরা তার বাবাকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করেছে বলে তার অভিযোগ।

এদিকে সংঘর্ষ চলাকালে ইজতেমা ময়দানের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ আশপাশের সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। আহতদের উদ্ধার করে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. কমর উদ্দিন জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ২শ’ ব্যক্তি আহত অবস্থায় ওই হাসপাতালে যান এবং চিকিৎসা নেন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন ময়মনসিংহের আশরাফুল, হাজি রেজাউল করিম, জুয়েল, মতিউর রহমান, মাহমুদ, শামীম, মনিরুল ইসলাম, মানিক, দাউদ, তাহের আলী, নাঈম, জহিরুল ইসলাম, জামাল খান, মাহবুবুর রহমান, রুস্তম আলী, রাশেদ, শেখ আব্দুর রব, হামিদ, মাহফুজুর রহমান, মুরাদ, শহীদুল ইসলাম, রিয়াজুল ইসলাম ও রিফাত। আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল থেকে ১৮ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, সংঘর্ষের ঘটনায় ওই ১৮ জনসহ ৩৫ জন এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে দু’জন ভর্তি আছেন। এ ছাড়া একই ঘটনায় আহত সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮ জন।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ঢাকার সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অন্তত ২৫-৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আটকা পড়ে হাজার হাজার যানবাহন। চরম ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সিটি মেয়রের মধ্যস্থতায় ৬-৭ ঘণ্টা পর উভয়পক্ষ ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে যান চলাচল শুরু হয় ওই এলাকায়।’

গাজীপুর জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর জানান, দুই পক্ষের শীর্ষ মুরব্বিদের নিয়ে বিকেল ৩টায় ইজতেমা ময়দানে তারা জরুরি সভায় বসেন। গাজীপুর সিটি মেয়র মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও মহানগর পুলিশ কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমানের উপস্থিতিতে উভয়পক্ষ ময়দান ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচনের আগে ইজতেমা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘উভয়পক্ষকেই বোঝাতে সক্ষম হয়েছি আমরা। ইজতেমা ময়দান ইসলামের দাওয়াত প্রচারের জায়গা, মারামারি করার জায়গা নয়। ইসলাম প্রচারকদের কাছ থেকে যদি মানুষ কষ্ট পায়, তাহলে সেটা বড় বেমানান।’

প্রিয় পাঠক, আপনিও হতে পারেন আওয়ার বাংলা অনলাইনের একজন সক্রিয় অনলাইন প্রতিনিধি। আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা, অপরাধ, সংবাদ নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুনঃ [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :