আমরা এক পৃথিবীর সন্তান

  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৪:১০ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৮

বৈচিত্র্যময় জীববৈচিত্র্য ও কৃষ্টি বাংলাদশের এক অন্যতম সম্পদ। জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে বাঙালির জীবনধারা। এদেশের অনেক অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য সংক্রান্ত লোকায়ত জ্ঞানভাণ্ডার আছে। ঔষধি গাছের জ্ঞান, বন্যপ্রাণী ও বন সংক্রান্ত লোকায়ত জ্ঞান বর্তমানে মানবজাতির অন্যতম সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। পরিবেশবিদদের ধারণা- এসব লোকায়ত বিশ্বাসের সঙ্গে ইকোলজির জ্ঞানের মিশ্রণ হলে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের পথনির্দেশ পাওয়া যেতে পারে। স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষাকারী গাছ না কাটার প্রথা হচ্ছে লোকায়ত কৃষ্টি। পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে মানুষের অধিকারের সীমারেখা কতটুকু এ প্রশ্নটি উঠে এসেছে। নিজের স্বার্থে মানুষ মনুষ্যত্বের ওপর নির্মম অত্যাচার করছে। প্রাকৃতিক উৎসগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে উন্নয়নের নামে পরিবেশ দূষণকারী কলকারখানা স্থাপন করছে। জলাশয় ভরাট করে নষ্ট করছে পরিবেশের ভারসাম্য। এ সবকিছু করা হচ্ছে ভোগবাদী মানসিকতাকে চরিতার্থ করার জন্য। পরিবেশবিদরা বলছেন, ক্ষুদ্র ভৌগোলিক এককের কথা। এর প্রাণিজগৎ, উদ্ভিদজগৎ মিলে রয়েছে লোকসংস্কৃতির একটি নিজস্ব ছন্দ। উন্নয়নের নামে যাতে এই ছন্দকে ধ্বংস করা না হয় সেদিকে শুভ দৃষ্টি দিতে হবে।

পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। কুড়ি হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে অপসারিত হয়েছিল তুষার যুগ। সূচনা হয়েছিল উষ্ণ যুগের। সেই থেকে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে উষ্ণতা। অবশ্য এই বৃদ্ধিতে ভারসাম্য বজায় ছিল। মানুষ যখন আগুন জ্বালানো শিখল তখন থেকে এই ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে শুরু করল। বর্তমান শতাব্দীতে সেই ভারসাম্য অধিকাংশই বিনষ্ট হয়ে গেছে। বিশ্বে দ্রুত কলকারখানা বৃদ্ধির কারণে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা সৃষ্টি করছে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বৃদ্ধি অসহনীয়। প্রায় বছরজুড়েই গ্রীষ্মের পদচারণা অনুভূত হয়। পরিবেশবিদদের অভিমত, শীতে অভ্যস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের তীব্র দাবদাহে বিবর্তন শুরু হবে। বিচিত্র সব গুণের প্রকাশ পাবে। পরিবেশ উত্তপ্ত হলে কীটপতঙ্গ মাত্রারিক্তভাবে বংশবিস্তার করবে। ফলে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। যার বিষক্রিয়াতে জর্জরিত হয়ে উঠবে ভূমণ্ডল। বৃদ্ধি পাবে পরজীবীর সংখ্যা। ভাইরাসের আক্রমণ বাড়বে। জীবন তখন হয়ে পড়বে বিপন্ন। মেরুদেশের বরফ তখন বেশি বেশি গলবে। সৃষ্টি হবে মহাপ্লাবন। আগামীতে উপকূলভাগে আর জনবসতি থাকবে না। বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে নিঃশেষ হয়ে যাবে বিরল প্রজাতির প্রাণীকুলও। ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের ৪৫ সেন্টিমিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে দেশের উপকূলীয় প্রতিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে খাদ্য উৎপাদন। উপকূলীয় ২০টি জেলার প্রায় তিন কোটি মানুষ অন্যত্র বসবাসে বাধ্য হবে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর সৃষ্ট সমস্যার কারণে মাশুল গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিশ্বের মোট কার্বন ঘনত্বে বাংলাদেশ মাত্র এক শতাংশ যোগ করে থাকে। অপরদিকে শিল্পোন্নত চার-পাঁচটি দেশ যোগ করে থাকে প্রায় ৬০ শতাংশ।

বিশ্বে বিগত তিনশ’ বছরের অন্ধ উন্নয়ন প্রচেষ্টার জন্য সৃষ্টি হয়েছে এই বিপর্যয়। শিল্পবিপ্লবের ঘটনায় প্রকৃতিকে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে তারই পরিণাম হিসেবে জলবায়ুর পরিবর্তনকে ভাবা হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত ১০ হাজার বছরে প্রাকৃতিকভাবে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরিত হয়েছে, বিগত তিনশ’ বছরে তার দ্বিগুণ কার্বন জন্মেছে। এই সময়ে বিশুদ্ধ পানির প্রায় অর্ধেকই ব্যবহৃত হয়েছে। মৌসুমি অঞ্চলে বিভিন্ন প্রাণ-প্রজাতির বিলুপ্তির হার ১০ হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত তিনশ’ বছরে সীমাহীনভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছে তা ইতিহাসে একটি ‘কৃষ্ণ অধ্যায়’ হিসেবে পরিগণিত হবে। এটি ছিল দুঃসময় নির্মাণের প্রক্রিয়া।

মানুষের জীবনযাত্রায় অরণ্যের ভূমিকা সম্পর্কে প্রাচীনকালের মুনি-ঋষিরা অবগত ছিলেন। সে কারণে নিজেদের বেঁচে থাকার সঙ্গে অরণ্যকে বাঁচিয়ে রাখার কথা বিবেচনা করতেন। বর্তমানে দ্রুত গতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ তার জীবনের প্রয়োজনেই নিরীহ পশুপাখির প্রতি অত্যাচারী হয়ে উঠছে। ক্ষুধা নিবৃত্তির প্রয়োজনে অরণ্য এবং অরণ্যবাসী পশুপাখি নিঃশেষ করছে। সাম্প্রতিককালের সভ্যতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে অমানবিক স্বার্থপরতা হিসেবে। বিবেকবান মানুষের প্রশ্ন- এই জগৎ-সংসারে মানুষ কীভাবে নিজেদের মূল্যায়ন করবে- বাকি জীবজগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক সত্তা হিসেবে; নাকি জীবজগতের অঙ্গীভূত এক সত্তা হিসেবে? মানুষ জীবজগৎ থেকে স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বৈরী জলবায়ুর কারণে বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রে, নিম্ন ব-দ্বীপ অঞ্চলেও। এই স্থানান্তরিত জনগোষ্ঠী তৈরি করবে নতুন সামাজিক অস্থিরতা। বর্তমান পৃথিবীতে একশ’ কোটিরও বেশি লোক চরম খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছে। অপুষ্টি আরেক সমস্যা। বৈশ্বিক উষ্ণতা খাদ্য অনিরাপত্তার সমস্যাকে ক্রমাগতভাবে বাড়িয়ে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত দুর্যোগও এজন্য দায়ী।

জীববৈচিত্র্য হল বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের সহাবস্থান। মানুষের সমাজের সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে। প্রকৃতিকে কোনো অবস্থাতেই বিপন্ন করা যাবে না। মূল্যবোধ গ্রহণ করতে হবে প্রকৃতি থেকে। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য হচ্ছে সহনশীলতার প্রতীক। প্রকৃতিতে পরিলক্ষিত হয় পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। প্রকৃতির স্থায়িত্ব ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানাতে শেখায়।

বিশ্বায়নের ফলে বিপন্ন পৃথিবীকে বাঁচাতে একজোট হতে পারে পৃথিবীর মানুষ। পৃথিবীকে ঘিরে এর অধিবাসীদের যেতে হবে নতুন এক জাতীয়তাবাদের দিকে, যার নাম ধরিত্রীকেন্দ্রিক জাতীয়তা। প্রধান উপজীব্য হবে- ‘ধরিত্রীকেন্দ্রিক জাতীয়তা’। সঙ্কটাপন্ন পৃথিবীকে বাঁচাতে পারে এই চেতনা।

আপনার মতামত লিখুন :